সকল নাগরিকের খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে
খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তার জনইশতেহার
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৫/১ ধারায় প্রত্যেক মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কেবল খাবার খাওয়াই যথেষ্ট নয়; পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা আবশ্যক। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো অনুযায়ী, সাংবিধানিক দায়িত্বের বাইরে রাষ্ট্রের ওপরও সকল নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তায়। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR) স্বাক্ষর ও সমর্থনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নাগরিকদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কাজের অধিকারসহ মৌলিক মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার লক্ষ্য ২ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা দূরীকরণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
খাদ্য সংকট সম্পর্কিত বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০২৫ বলছে, তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০২৫-এ ১২৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৫তম, যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১০.৪ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। জাতীয় পর্যায়ের বিশ্লেষণ বলছে, দেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং এর মধ্যে ১৬ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার। আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক চাপ ও মানবিক সহায়তার ঘাটতি এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য বাংলাদেশে নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী সংকট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৪৯ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.৭১ শতাংশ। আঞ্চলিক মূল্য বৈষম্য, আমদানিনির্ভরতা, বাজার সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী ও মজুদদারির কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর ওপর অসমভাবে প্রভাব ফেলছে, তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং জীবিকা ঝুঁকির মুখে ফেলছে। গবেষণা বলছে, পরিবারগুলো তাদের মাসিক ব্যয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। দারিদ্র্য বৃদ্ধি, সম্পদহানি ও খাদ্য উৎপাদনে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই সংকটকে আরো তীব্র করে তোলে। বর্তমানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ, যাদের অনেকেই দারিদ্র্যসীমার ঠিক নিচে বসবাস করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো ধাক্কায় আরো ১৮ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রান্তিক ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্য ঝুঁকি সবচেয়ে প্রকট। সারাদেশে ১৬৭টি চা বাগানের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক বেকার জনগোষ্ঠী এবং প্রায় আড়াই লাখ বেকার নারী-পুরুষ আছে। একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা; যে টাকায় চিকিৎসা, বাসস্থান, পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ সবই সাধ্যের বাইরে। এর সাথে রয়েছে মজুরি প্রদানে বিলম্ব, আবাসন, স্বাস্থ্যসহ নানা সংকট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘের ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের জরিপ অনুযায়ী, চা বাগানের প্রায় ৭৪ শতাংশ শ্রমিক এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। শহরাঞ্চলে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বস্তিতে বসবাসকারী পরিবারের অর্ধেকের বেশি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, যার ফলে প্রায় অর্ধেক শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং কিশোরী মেয়েদের, বিশেষ করে ১৫ বছরের কম বয়সী ও গর্ভবতী কিশোরীদের মধ্যে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও আয় হ্রাসের কারণে খাদ্যের গুণগত মান ও প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া বাংলাদেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য দীর্ঘদিনের একটি অলিখিত শোষণ-বঞ্চনার বাস্তবতা। কৃষি নির্ভরশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে সবচেয়ে অবহেলিত গোষ্ঠী হচ্ছে কৃষক। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ফসলহানি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান প্রাতিষ্ঠানিক অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের চাপ কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তায় একটি কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে। বন্যা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতসহ মনুষ্যসৃষ্ট নানা দুর্যোগে কৃষকের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা ও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির সুযোগের অভাব ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণভার আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে বারবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত অর্থনৈতিক চাপে কৃষকের মৃত্যুর খবর কৃষি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে। এসব বাস্তবতা দেখায় যে কৃষকরা শুধু খাদ্য উৎপাদন করবে এমন ধারণাই যথেষ্ট নয়; তাদের নিজেদের ও পরিবারের জন্য নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।
এর পাশাপাশি খাদ্য ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের লিঙ্গ বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগোষ্ঠী, বেদে সম্প্রদায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, জলবায়ু বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী, হরিজন সম্প্রদায়, মান্তা সম্প্রদায় ইত্যাদি নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগোষ্ঠী। কাউকে পেছনে ফেলে নয, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মূলমন্ত্র বাস্তবায়নে এই সকল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, জীবনযাপনের সংকট বিবেচনা করা তাদের খাদ্য নিরাপত্তায় উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
বাংলাদেশে অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য অপুষ্টি এখনো একটি গুরুতর সমস্যা। পরিসংখ্যান বলছে দেশের প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ নারী অপুষ্টিতে ভুগছেন। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩০.৭ শতাংশ খর্বাকৃতি এবং ২১.৮ শতাংশ কম ওজনের। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০২৪ অনুযায়ী, ১১.৯ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে আক্রান্ত এবং প্রায় ২৩.৬ শতাংশ শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশে বেকারত্বের সংকটও খাদ্যের অধিকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ লাখ ২০ হাজারে। পাশাপাশি, ১৫-২৯ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি তরুণ-তরুণী শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। বেকারত্ব সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি করে, কারণ আয়ের অভাবে পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত খাবার কেনার সামর্থ্য কমে যায়, যা অপুষ্টি ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য দৈনিক কমপক্ষে ২,১২২ ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর হিসাব অনুযায়ী, এই ন্যূনতম ক্যালরি চাহিদা পূরণে গড়ে একজন মানুষের মাসিক খাদ্য ব্যয় দাঁড়ায় ১,৮৫১ টাকা, যা বিবিএস ‘খাদ্য দারিদ্র্যসীমা’ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাজারদরের বাস্তবতায় এ পরিমাণ ব্যয়ে একজন মানুষের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বিবিএস প্রকাশিত খাদ্যনিরাপত্তা পরিসংখ্যান ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবার মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই ঋণের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে, যা খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকাগত ঝুঁকির গভীরতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতাসহ নানাবিধ কারণে এসব কর্মসূচি দেশের ক্রমবর্ধমান সামাজিক সুরক্ষার চাহিদা পূরণে অপ্রতুল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ নির্ধারিত হয়েছে ৭,৮৯,৯৯৯ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১,৩৬,০২৬ কোটি টাকার তুলনায় কম। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বেশ জটিল। কর্মসূচির কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও পুনরাবৃত্তি কমানোর লক্ষ্যে গেল বছর মোট কর্মসূচির সংখ্যা ১৪০ থেকে কমিয়ে ৯৭-এ আনা হয়েছে। আবার কিছু কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়লেও ভিজিএফ ও অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্কিমে উপকারভোগীর সংখ্যা কমেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের প্রেক্ষাপটে এসব কর্মসূচির বাজেট হ্রাস খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা সংকট বৃদ্ধি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
খাদ্য সরাসরি স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও জীবনমানের সঙ্গে যুক্ত। তাই নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যে প্রবেশাধিকারকে শুধু প্রয়োজন নয়, একটি আইনগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন। খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় কল্যাণ নিশ্চিত করতে এক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। এফএওর খাদ্য অধিকার বিষয়ক ভলান্টারি গাইডলাইন আলোকে খাদ্যের অধিকার সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও এর যথাযথ বাস্তবায়ন, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নীতি ও বিধিমালা সংশোধন অত্যন্ত জরুরি।
আমরা প্রত্যাশা করি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সংসদে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করবেন এবং তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করবেন এই আশায় আমরা বাংলাদেশের গণমানুষের পক্ষে নিম্নের ১০টি দাবি তুলে ধরছি।
১. নাগরিকের খাদ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করা
বাংলাদেশের সংবিধানে খাদ্যসংক্রান্ত বিষয় আলাদাভাবে উল্লেখ থাকলেও সেখানে খাদ্যকে জনগণের অধিকার হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা সংবিধানের মৌলিক নীতিমালার অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত, মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সদস্য, ১৯৯৩ সালের ভিয়েনা ঘোষণা এবং ইকোসকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির ‘পক্ষ’ হিসেবে বাংলাদেশ খাদ্যের অধিকার বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। খাদ্য অধিকার বিষয়ে যথাযথ আইনি কাঠামো প্রণয়ন না করে শুধু ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি’-এর মধ্য দিয়ে সমাধান করতে চাইলে সেখানে মানবাধিকারের পরিবর্তে ‘দান/দয়া’র দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। তাই সকল নাগরিকের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে এফএও ‘ভলান্টারি গাইডলাইন অন রাইট টু ফুড’-এর আলোকে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করা জরুরি। এই আইন শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সহায়ক হবে না, বরং সামাজিক সুরক্ষার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে, বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোকে সুসংহত করবে এবং জনগণকে তাদের অধিকার দাবি করার সক্ষমতা দেবে। একই সাথে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং এই আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যসংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন-নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।
২. উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় বাজার ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক তথ্যভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এখনো অন্যতম স্থায়ী ও গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯-১০ শতাংশের আশপাশে, যার প্রধান কারণ ছিল খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি। এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর, বিশেষ করে স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারের ওপর, দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হয়েছে। খুচরা বাজারে ভোক্তাদের উচ্চমূল্যে খাদ্য কিনতে হচ্ছে আবার একই সময় কৃষক, যারা খাদ্যের উৎপাদক, তারাই ক্ষতির মুখে পড়ছেন। কারণ অনেক সময় উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকে। আবার তারা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির সুফল তাদের কাছে পৌঁছায় না। এই বৈষম্যের মূল কারণ হলো দুর্বল বাজার কাঠামো, নীতিগত সমন্বয়ের অভাব, পর্যাপ্ত তদারকির ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক নানামুখী অভিঘাত। এসব সমস্যা নিরসন এবং উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় বাজার ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং শক্তিশালী করা, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
৩. ওষুধভিত্তিক পুষ্টির পরিবর্তে খাদ্যভিত্তিক পুষ্টির ওপর জোর দেয়া
বাংলাদেশ বর্তমানে শস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও জনগণের মধ্যে এখনো সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠেনি। বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো অপর্যাপ্ত ও নিম্নমানের খাদ্যের কারণে ভুগছে, আর অনেক মানুষ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্যে প্রবেশাধিকারের নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। অপুষ্টি সরাসরি মানুষের সক্ষমতাকে দুর্বল করে, কর্মদক্ষতা কমিয়ে দেয় এবং জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে কারণ কর্মক্ষম মানবসম্পদ যেকোনো দেশের উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুষ্টিজনিত রোগের চিকিৎসায় কেবল ওষুধনির্ভরতার পরিবর্তে পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে জ্ঞান ও সচেতনতা গড়ে তোলার ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই খাদ্যকে একটি মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানের ১৫ ও ১৮ অনুচ্ছেদের আলোকে খাদ্যকে মৌলিক প্রয়োজন এবং পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির কেন্দ্রে রেখে খাদ্য সরবরাহের নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি ও সুরক্ষায় অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে।
৪. জনগণের কর্মসংস্থান ও পর্যাপ্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য ক্রয়ের সামর্থ্য নিশ্চিত করা
খাদ্যে প্রবেশাধিকার ও কর্মসংস্থানের অভাব একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, আর ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও সুষম খাদ্য সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির জরিপ বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ খাদ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে; উচ্চমূল্যের চাপ সামাল দিতে অনেককে সম্পদ বিক্রি করতে বা ঋণ নিতে হচ্ছে। পরিবারগুলো তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্যের পেছনেই ব্যয় করছে, ফলে অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য খুব কম অর্থ অবশিষ্ট থাকছে।
এদিকে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জন্স্য রেখে বাড়ছে না। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং আরো বেশি পরিবার দারিদ্র্যে পতিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল আয়ের অভাবে, বিশেষ করে স্বল্প আয়ের ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমজীবীদের ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছে, যা তাদের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, আয় সহায়তা জোরদার এবং বর্তমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় মজুরি নীতির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য চাল, ডাল ও আটার মতো প্রধান খাদ্যপণ্যের মূল্য কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।
৫. ঋতুভিত্তিক খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা প্রশমনে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও খাদ্য-সংকটপ্রবণ এলাকায় খাদ্য রেশনিংসহ সহায়তা নিশ্চিত করা
বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে স্বল্প আয়ের পরিবার, শহরের বস্তিবাসী, ভূমিহীন চরাঞ্চলের মানুষ, চাু-বাগানের শ্রমিক, হরিজন সম্প্রদায়, ভাসমানভাবে বসবাসরত নানা জনগোষ্ঠী এবং উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতা, কর্মহীনতা অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অভাব, সামাজিক বঞ্চনা, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ, মূল্যস্ফীতি এবং সম্পদে সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে এসব জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে ভুগছে। এর ফলে অনেকেই অপুষ্টিতে আক্রান্ত হচ্ছে এবং নিম্নমানের খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায়, হাওর এলাকার কৃষক এবং পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ প্রতিবছর ঋতুনির্ভর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়। এই সংকট খাদ্যের অভাবের কারণে নয়; বরং দারিদ্র্য, অপ্রতুল মজুরি, বেকারত্ব, বিকল্প আয়ের উৎসের অনুপস্থিতি এবং সময়মতো বা পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়াই এর মূল কারণ। যদিও এসব ঝুঁকি প্রতিবছরই ফিরে আসে, তবু ভৌগোলিক দূরত্ব, দুর্গমতা, জটিল প্রক্রিয়া, দুর্বল কমিউনিটি-ভিত্তিক কর্মসূচি পরিকল্পনা এবং যোগাযোগের ঘাটতির কারণে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা অনেক সময় এসব জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না।
মৌসুমি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা প্রশমনে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও খাদ্য-সংকটপ্রবণ এলাকাগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্য রেশনিং, কর্মসংস্থান ও বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং সময়োপযোগী সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
৬. কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে জাতীয় কৃষিপণ্য মূল্য কমিশন গঠন
বাংলাদেশের কৃষকেরা জলবায়ুজনিত দুর্যোগ, নীতিগত ঘাটতি, দুর্বল বাজার কাঠামো এবং কৃষি ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতার কারণে ক্রমবর্ধমান ক্ষতির মুখে পড়ছেন। কৃষিপণ্যের ন্যায্য ও পূর্বানুমেয় মূল্য নিশ্চিত করার জন্য দেশে এখনো কোনো জাতীয় কৃষিপণ্য মূল্য কমিশন গঠিত হয়নি। ফলে ফসল কাটার মৌসুমে হঠাৎ করে পণ্যের দাম ধসে পড়লে কৃষকেরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, অথচ একই সময়ে ভোক্তাদের খুচরা বাজারে উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয়।
উৎপাদন ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, বাজারে প্রবেশাধিকার ও দরকষাকষিতে কৃষকদের দুর্বল অবস্থান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কৃষকদের লোকসানি দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করছে। এর ফলে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ক্রমেই আরো গভীর হচ্ছে। এই সংকটের বাস্তব চিত্র হিসেবে ২০২৫ সালে ঋণভার ও আর্থিক দুর্দশাজনিত কৃষকের আত্মহত্যার খবর বছরজুড়েই গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় কৃষিপণ্য মূল্য কমিশন (Agricultural Price Commission – APC) গঠন করা জরুরি। এই কমিশনের দায়িত্ব হবে ফসল উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় নিরূপণ করা এবং ফসল কাটার শুরু ও প্রাথমিক বাজারজাতকরণ সময়ে প্রধান কৃষিপণ্যের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করা। এ ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি মূল্য কমিশন উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে ন্যায্য আয় বণ্টন নিশ্চিত করতে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে। চাহিদা-জোগানের পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয়, বাজারপ্রবণতা, বিভিন্ন ফসলের মধ্যে মূল্য সামঞ্জস্য এবং ভোক্তার ওপর প্রভাব বিশ্লেষণের মাধ্যমে কমিশন স্বচ্ছতা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং ন্যায্য মূল্যনিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।
একই সঙ্গে সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক ভ্যালু চেইন গড়ে তুলতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থার উন্নত করে প্রান্তিক কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ ও আরো সহজলভ্য করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
৭. অকৃষি খাতে কৃষিজমির ব্যবহার বন্ধ করতে ভূমির মালিকানা ও ব্যবহার আইন অনুমোদন এবং ল্যান্ড জোনিং বাস্তবায়ন
অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৬৮,৭৬০ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি অকৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ল্যান্ড জোনিং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে নির্দিষ্ট এলাকায় বসতি ও শিল্প স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলে আবাদযোগ্য জমিকে এই সংকটের হাতে থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শিল্প-কারখানা দ্বারা জলাশয় ও আবাদযোগ্য জমি দূষণ রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি। সরকার প্রথম ২০০৯ সালে “আবাদযোগ্য জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন” খসড়া প্রণয়ন করে, যা পরবর্তীতে “ভূমির মালিকানা ও ব্যবহার আইন” নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে এই আইনটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিজমি সুরক্ষার স্বার্থে এই আইনটি দ্রুত অনুমোদন ও কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি।
৮. দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঠিক ও নির্ভুল তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি ও পুষ্টি সংকট দূর করতে যথাযথ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ
সকল ঝুঁকিপূর্ণ, প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টিসিবি, ওএমএস-এর মতো কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সঠিক ও নির্ভুল ডেটাবেজ তৈরি করলে সহায়তা প্রদানে বঞ্চনা বা ভুল অন্তর্ভুক্তি কমানো সম্ভব হবে, পাশাপাশি জালিয়াতি ও দুর্নীতি প্রতিরোধেও সহায়ক হবে। তবে বাংলাদেশে ব্যাপক তথ্যের অভাব এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে অসুবিধা সৃষ্টি করছে।
সরকারকে উপকারভোগী চিহ্নিতকরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে বিশেষ সহায়তা কর্মসূচিতে, যাতে সম্পদের অপচয় কমানো যায় এবং কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য সঠিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৩৯ মিলিয়ন মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছে। এছাড়া প্রায় ৬২ মিলিয়ন মানুষÑজনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশÑঅসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত ধাক্কার কারণে আবার দারিদ্র্যের দিকে পতনের ঝুঁকিতে রয়েছে, অথচ বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ১২.৬ মিলিয়ন মানুষ।
বিশেষ করে শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কাঠামো ও আওতা সম্প্রসারণ করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিস্তৃত মানচিত্রায়ণের মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি চরম দরিদ্র পরিবারগুলোকে পুষ্টিকর খাদ্য যেমন ডিম, মাছ, দুধ ও সবজি প্রদানের পাশাপাশি প্রধান খাদ্য রেশন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে পুষ্টি সংকট দূর করা সম্ভব হয়।
৯. জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দুর্যোগ বিবেচনায় বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা, মর্যাদা এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে আগাম পদক্ষেপ ব্যবস্থা এবং অভিঘাত-প্রতিক্রিয়াশীল সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠা
জনসংখ্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সময়ের দিকে এগোচ্ছে। দেশের প্রথম জনসংখ্যাতান্ত্রিক লভ্যাংশের সময়কাল ২০৩৩ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ক্রমশ কমছে এবং বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে এটি ৬৫.০৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই পরিবর্তনে খাদ্যনিরাপত্তা এবং মর্যাদাসহ নাগরিকের জীবনযাপন নিশ্চিত করতে একটি বিস্তৃত ও দূরদর্শী খাদ্যনিরাপত্তা কৌশল অপরিহার্য।
একই সঙ্গে, জলবায়ু পরিবর্তন দেশের খাদ্য স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালে প্রায় ১৭% ভূমি পানির নিচে চলে যেতে পারে, যার ফলে প্রায় ১৮ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন এবং আবাদযোগ্য জমি ও খাদ্য সরবরাহ কমে যেতে পারে। ঘনবসতি ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কেবল প্রতিক্রিয়াশীল সাড়াপ্রদানমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর নির্ভর করতে পারবে না। তাই পূর্বাভাসমূলক ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ, সতর্কতা ব্যবস্থা এবং অভিঘাতভিত্তিক সাড়াপ্রদানে সক্ষম সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
১০. নগরকৃষি এবং পারিবারিক কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের ৩১.৬৬ শতাংশ জনসংখ্যা শহরে বসবাস করছে। মূলত কৃষি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা, সীমিত বিপণন সুযোগ এবং সম্পদের অভাবের কারণে শহরের বেশির ভাগ মানুষ খাদ্য উৎপাদনে নগণ্য কিংবা একদমই ভূমিকা রাখে না। নগর অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ নগর কর্মসংস্থানের ধীরগতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে, যা ২০১৭-২০২২ সালের মধ্যে গড়ে মাত্র ০.৮ শতাংশ প্রতি বছর বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে শহর কৃষি সম্প্রসারণ করা অপরিহার্য। জাতিসংঘ ২০১৯-২০২৮ সালকে পরিবারভিত্তিক কৃষির দশক হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা দারিদ্র্যের সীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং আয় সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। সেক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে পরিবারভিত্তিক কৃষি উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে স্থানীয় সরকার সংস্থা এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় শহর ও শহরতলি পরিবারের জন্য প্রযুক্তিগত পরামর্শ, সম্পদ সরবরাহ এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা যায়।
Read In BonikBarta: https://bonikbarta.com/bangladesh/srAzQyLo4OFKKukK
